কিংবদন্তী প্রকৌশলীর ১৫তম প্রয়াণ দিবস আজ

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ০৬:৩৪  

শোকাবহ আগষ্ট আরো প্রলম্বিত হয় সেপ্টেম্বরে। মাসের প্রথম দিনেই অনন্ত যাত্রায় পাড়ি জমান উদ্যোগ, উদ্যোম আর উন্নয়নের অনন্য প্রতীক কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। যিনি শুধু পেশায় নয়; জীবনের প্রকৌশলীতেও ছিলেন নিখাদ; পরিপাটি। এই আমৃত্যু মুক্তিযোদ্ধার হাতে দেশের স্থানীয় সরকার প্রৌকশল অধিদপ্তর কেবল প্রতিষ্ঠা লাভই করেনি; সরকারি সেবার উজ্জ্বলতম অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক স্বীকৃত এই ‘ম্যাজিক বয়’এর আজ তাঁর ১৫তম মৃত্যু বার্ষিকী।

জীবদ্দশায় মুক্তিযুদ্ধে যেভাবে অস্ত্র হাতে তিনি গর্জে উঠেছিলেন; বিজয় মাল্য পড়ে যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশ পুণর্গঠনে একইভাবে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের যুদ্ধেও ছিলেন হার না মানা কর্মবীর। জীবদ্দশায় অন্ধকার দূরে ঠেলে দিতে কাজ করেছেন বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড এর চেয়ারম্যান হিসেবে। ঢাকা পরিবহন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে নগরীর আজকের মেট্রোরেল থেকে শুরু করে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন যমুনা সেতু বাস্তবায়নেও। সরকারি-বেসরকারি দূরত্ব ঘুচে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বেসরকারীকরণ কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবেও রেখেছেন অনন্য ভূমিকা।

এই যেমন-তার নেতৃত্ব গুণেই বিশ্বব্যাংক ১৯৯৪ সালে 'Government that works, reforming the public sector’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে এলজিইডিকে বাংলাদেশের একটি সফল ও কার্যকর সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে।  শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ করে চাষের জন্য রাবার ড্যাম (Rubber Dam) প্রকল্প চালু করে দেশকে খাদ্য উৎপাদন স্বয়ংস্পূর্ণ করণের পথও রচনা হয় তাঁর হাতেই।

ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র ও ন্যাম ফ্ল্যাট প্রকল্প তারই তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত হয়। ঢাকার যানজট দূরীকরণে আজকের ফ্লাইওভার ব্যবস্থা তারই নেতৃত্বে শুরু হয় এবং খিলগাঁও ফ্লাইওভার প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করে, দেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে দিয়ে গেছেন। তিনি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতির বিষবৃক্ষ সিবিএর নেতাদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে গণবদলির মাধ্যমে এ চক্রকে লন্ডভন্ড করে দেন। তৎকালীন সময়ে সিবিএ নেতাদের নির্দেশে চলত বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের যে কোনো স্তরের বদলি ও যে কোনো পরিবর্তন। কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের পদক্ষেপে যেমন সিবিএর প্রভাব হ্রাস পায়, তেমনি সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ (১৯৯৮ সালে) ২৮০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের ইতিহাস তৈরি হয়। নানা দুর্নীতির কারণে যে সময়ে গড়ে প্রতিদিন বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো সর্বোচ্চ ১৮০০-২০০০ মেগাওয়াট।

মাত্র ৬৩ বছরের জীবনে মেধা, শ্রম আর অধ্যাবসায়ে জনপ্রশাসনে আজো তিনি আদর্শ হয়ে আছেন অনুজদের কাছে। বিনম্র শ্রদ্ধায় যুগ-যুগান্তর জেগে থাকুন জাতীয় উন্নয়নের মর্মে মর্মে। উন্নয়নের আলোয় উদ্ভাসিত হোক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

সেই প্রত্যাশাতেই সদর দপ্তর জামে মসজিদসহ দেশজুড়ে সংস্থাটির প্রতিটি মসজিদে দোআ ও আলোচনা অনুষ্ঠান করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশ অধিদপ্তর।

প্রসঙ্গত, ১৯৪৫ সালের ২০ জানুয়ারি কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। পিতা কৃষিচিন্তক প্রয়াত নূরুল ইসলাম সিদ্দিক এবং রত্নগর্ভা মা বেগম হামিদা সিদ্দিকের দ্বিতীয় সন্তান সিদ্দিকের শৈশব ও শিক্ষা জীবনের প্রথম অধ্যায় কাটে লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ এবং মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতিধন্য কুষ্টিয়ায়।

তুখোর মেধাবী কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ১৯৬৬ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে কুষ্টিয়া জেলা পরিষদে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জীবন গড়ার স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে হাতে তুলে নেন অস্ত্র। নয় মাস মুক্তি সংগ্রামে বিজয়ের পর নতুন করে শুরু করেন দেশ গড়ার সংগ্রাম।

১৯৭৭ সালে যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবান এন্ড রিজিওনাল প্ল্যানিংয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। এলজিইডির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে নিরলস পরিশ্রম করে হয়ে ওঠেন অবকাঠামো উন্নয়নের প্রবাদ পুরুষ। উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছেন একমাত্র পুত্র সন্তান সাইফুল ইসলাম সিদ্দিক-কে। পিতার মতো তিনিও বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে নিয়োজিত। উদ্ভাবনী শক্তি গণমাধ্যমের ডিজিটাল রূপান্তর, লাইভস্ট্রিমিং এর মতো কাজে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) এর জ্যেষ্ঠ সহভাপতি ও ডিজিটাল বাংলা মিডিয়ার সম্পাদক।